৩০ বছরে কমেছে ফসলি জমি, বাড়ছে লবণাক্ততা ও অনাবাদি জমি | জীবিকার সংকটে অন্যত্র পাড়ি, প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরছেন অনেকে | সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলেএকদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নোনা জল। মাঝখানে মানুষের বসতি। জীবনের প্রতিটি দিন যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম লড়াই। কখনো বাঘ-কুমিরের ভয়, কখনো নদীভাঙন, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত। লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষিজমি কমছে, অনাবাদি জমি বাড়ছে, সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই; প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে ফিরছেন নিজ ভিটায়।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরা উপকূল—বিশেষ করে শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে এমন বাস্তবতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো বছরের একটি বড় সময় বন ও নদীকেন্দ্রিক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। অথচ তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের জীবন এই সংকটের সবচেয়ে কাছের উদাহরণ। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও প্রান্তিক কৃষকরা নিষেধাজ্ঞার সময় আয় হারান। পরিবারপ্রতি সীমিত সরকারি সহায়তা মিললেও তা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের সংসার চালানো কঠিন। রাতের অন্ধকারে কোনো মা বা শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসা ও যাতায়াতের সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির কোলে অনিশ্চিত জীবন
যতীন্দ্রনগর জেলেপাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) সেই অনিশ্চিত জীবনেরই একজন প্রতিনিধি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসার চালান। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বনে যাওয়া শুরু করেছিলেন সুরমা। এখন স্বামীর হাত ধরে একই জীবিকার পথে হাঁটছেন।
কিন্তু এই পথেরও সীমা আছে।
নিষেধাজ্ঞার সময় বন ও নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরার সুযোগ থাকে না। তখন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় পরিবারগুলোকে। কিন্তু অল্প কিছু চাল দিয়ে পুরো পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। সুরমার নিজের কোনো সঞ্চয় নেই। তাই জীবিকার বিকল্প পথ খুঁজছেন তিনি।
জোয়ারের সঙ্গে যাদের জীবন দোলে, ঢেউয়ের সঙ্গে যাদের প্রতিদিনের হিসাব—তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের বৈজ্ঞানিক শব্দ নয়। এটি তাদের হাঁড়িতে, ঘরে, জমিতে, পানির কলসিতে এবং সন্তানের ভবিষ্যতে প্রতিদিনের বাস্তবতা।
লবণাক্ততায় কৃষির সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাতগুলোর একটি পড়ছে কৃষিতে। উপকূলের অনেক এলাকায় নদী ও জলোচ্ছ্বাসের লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে অনেক জমিতে আগের মতো ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের একটি অংশ এখন লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ও অন্যান্য অভিযোজনযোগ্য ফসল চাষের চেষ্টা করছেন। কিন্তু জমির লবণাক্ততা, সেচের পানির সংকট এবং মৎস্যঘেরের জন্য লবণ পানি প্রবেশের অভিযোগ তাদের সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাগেরহাট ও রামপালের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও কোথাও কৃষিজমিতে মাছের ঘের সম্প্রসারণের কারণে কৃষকের জমিতে লবণ পানি প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার আগেই ঘেরে পানি ঢোকানো হলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার খালে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করার অভিযোগও রয়েছে কোথাও কোথাও।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মৎস্যচাষিদের বক্তব্য নিয়ে পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ উপকূলে কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতই মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ পথ
উপকূলের মানুষের আরেকটি বড় সংকট সুপেয় পানি। অনেক এলাকায় পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির উৎস সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় নারীদের। অনেক পরিবারে নারীদের দূরবর্তী স্থান থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে শোনা যায়।
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। বাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে পড়লে পুকুর ও অন্যান্য মিঠা পানির উৎস দূষিত হয়ে যায়। তখন নিরাপদ পানি সংগ্রহ হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম প্রধান চিন্তা।
দুর্যোগের পর দুর্যোগ
বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষদের কাছে সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস ও রিমাল শুধু ঘূর্ণিঝড়ের নাম নয়—প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাঙা ঘর, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, নোনা পানি, হারানো ফসল, গবাদিপশু এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।
ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যুক্ত হওয়ায় উপকূলীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ও কমে আসছে। একটি দুর্যোগের ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি দুর্যোগ এসে নতুন ক্ষত তৈরি করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এই অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবনের বিস্তৃতি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার; বাংলাদেশের অংশ প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার চাপ, নদীভাঙন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন চাপ এই প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক সংরক্ষণ নথিতেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ও ঘূর্ণিঝড়সহ জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের শঙ্কা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি, জীববৈচিত্র্য, অভিবাসন ও নগরজীবন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতির অধীনে শতাব্দীর শেষ নাগাদ আঞ্চলিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিভিন্ন মাত্রার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ভর করছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও নির্গমন কমানোর মাত্রার ওপর।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারের পরিকল্পনায় ২০২৩-২০৫০ সময়কালে বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাপক অভিযোজন কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে বলে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পরিসরেও জানিয়েছে।
কিন্তু পরিকল্পনা থাকলেই হবে না—তার সুফল পৌঁছাতে হবে নদীর পাড়ের সেই পরিবারটির কাছে, যে পরিবার প্রতিদিন নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করছে।
সুন্দরবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জেলে মাছ ধরেন, মৌয়াল মধু সংগ্রহ করেন, বাওয়ালি বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেন—অসংখ্য পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বন ও এর জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে দুর্যোগের সময় সুন্দরবন উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করা মানে শুধু বাঘ, হরিণ, কুমির বা পাখিকে রক্ষা করা নয়; উপকূলের মানুষের ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করা।
সমাধান কোথায়?
উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ, কৃষকদের মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা, নদী-খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের টেকসই সংস্কার জরুরি।
একই সঙ্গে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির আধার ও কমিউনিটি রিজার্ভার গড়ে তুলতে হবে। পুকুর পুনঃখনন, পানি সংরক্ষণ এবং ঘরে ঘরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাড়ানো প্রয়োজন।
কৃষির পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মৎস্যসম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে জেলেদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য উঁচু ভিত্তির ঘর, কার্যকর সাইক্লোন শেল্টার, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা এবং উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, অভিযোজন অর্থ এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ তহবিল থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশ আদায়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।
শুধু বাঁচার লড়াই নয়, টেকসই ভবিষ্যতের দাবি
সুন্দরবন উপকূলের মানুষের গল্প মূলত টিকে থাকার গল্প। তারা বারবার ঘর হারিয়েছেন, জমি হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন; তবুও ফিরে এসেছেন নদীর পাড়ে, বনের কাছে, নিজের ভিটায়।
কিন্তু প্রশ্ন এখন একটাই—আর কতদিন?
যে মানুষটি বছরের পর বছর নোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে একটি ছোট্ট ঘর টিকিয়ে রেখেছেন, তাকে শুধু ত্রাণ দিলে হবে না। তাকে নিরাপদ পানি দিতে হবে, কৃষির সুযোগ দিতে হবে, বিকল্প কর্মসংস্থান দিতে হবে, চিকিৎসা দিতে হবে এবং দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দিতে হবে।
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে মানুষের জন্য, আবার মানুষকেও বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের জন্য। কারণ এই বন ও উপকূলের মানুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তারা একই জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থার অংশ।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের উপকূল কেমন হবে। নোনা পানির অনিশ্চিত জনপদ, নাকি নিরাপদ, উৎপাদনশীল ও টেকসই এক উপকূল?
উত্তরটা সময়ই দেবে। তবে প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই।ছবি: সংযুক্ত